
আপনি, হ্যাঁ আপনিই! যে এখন হয়তো একা ঘরে দরজা বন্ধ করে আমার এই লেখাটা পড়ছেন আর ভাবছেন, "ধুর, কী সব বলছে!" রাতের অন্ধকারে স্মার্টফোনের নীল আলোয় ডুবে গিয়ে যে নিষিদ্ধ জগতে আপনি ডুব দেন, আমি সেই জগতের কথা বলতে এসেছি। আমি, আমার চেম্বারে আপনার মতো যুবক, বিবাহিত পুরুষদের আসতে দেখি প্রতিদিন। তাদের চোখেমুখে যে হতাশা, যে লজ্জা, যে ব্যর্থতার গ্লানি আমি দেখি, সেই গল্পই আজ আপনাদের শোনাবো। কোনো রাখঢাক না করে, সরাসরি।

আপনারা প্রশ্ন করেন, "অতিরিক্ত পর্ন দেখলে কি যৌন শক্তি নষ্ট হয়?"

আমার সোজাসাপ্টা উত্তর: হ্যাঁ, হয়। শুধু নষ্ট হয় না, আপনার পুরুষত্বকে ভেতর থেকে এমনভাবে ঝাঁঝরা করে দেয় যা আপনি হয়তো টেরও পাচ্ছেন না। এটা কোনো জ্ঞান দেওয়া নয়, এটা খাঁটি বিজ্ঞান আর আমার দেখা শত শত জীবন্ত লাশের অভিজ্ঞতা।

যখন আপনি পর্ন দেখেন, তখন কী হয় জানেন? আপনার মস্তিষ্কে "ডোপামিন" নামক এক রাসায়নিকের বন্যা বয়ে যায়। এই ডোপামিন হলো আনন্দের হরমোন। ড্রাগস নিলে বা জুয়া জিতলে যে তীব্র আনন্দ হয়, পর্ন দেখলে ঠিক তেমনই একটা কিক্ পায় আপনার মস্তিষ্ক।

এখন সমস্যাটা কোথায়? আপনি যখন প্রতিদিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই কৃত্রিম আনন্দের বন্যায় নিজেকে ভাসিয়ে দেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সে সাধারণ, স্বাভাবিক যৌন মিলনে আর আগের মতো সাড়া দেয় না। আপনার প্রেমিকা বা স্ত্রীর স্বাভাবিক স্পর্শ, ভালোবাসা, উত্তেজনাকে আপনার মস্তিষ্কের কাছে "বোরিং" বা "ফ্যাকাসে" মনে হয়। কারণ, আপনার মস্তিষ্ক তখন স্ক্রিনের ওই হাজার ওয়াটের আলো, অবাস্তব শারীরিক গঠন আর বিকৃত অভিনয়ের জন্য অপেক্ষা করে। একে বলা হয় "Porn-Induced Erectile Dysfunction" (PIED)। সোজা বাংলায়, পর্নের কারণে আপনার লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা হচ্ছে।

ভেবে দেখুন, আপনি এমন একটা ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ছেন, যার ফলে বাস্তব জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা আপনার কাছে মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। আপনি নিজের হাতে নিজের যৌন জীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছেন!

সমাজের সবচেয়ে বড় ভণ্ডামিটা তো আপনারা নিজেরাই করছেন। দিনের বেলায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী অধিকার নিয়ে বড় বড় কথা লেখেন, মা-বোনের সম্মানের কথা বলেন। আর রাতের বেলা সেই আপনারাই পর্ন সাইটে গিয়ে এমন সব ক্যাটাগরি সার্চ করেন যা মুখে আনাও পাপ। সেখানে নারীদের যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেটাকে কি সম্মান বলে?

পর্নের ওই নায়িকারা কি আপনার বাস্তব জীবনের প্রেমিকা বা স্ত্রীর মতো? তাদের ওই অভিনয়, ওই অবাস্তব শীৎকার, ওই অস্বাভাবিক শারীরিক মিলন কি সত্যি? না! ওটা পুরোটাই একটা সাজানো নাটক। একটা ব্যবসা। আর সেই ব্যবসার কাঁচামাল হলেন আপনি। আপনার এই আসক্তিকে পুঁজি করেই কোটি কোটি টাকার ইন্ডাস্ট্রি চলছে। তারা আপনাকে একজন বিকৃত মানসিকতার খদ্দেরে পরিণত করছে, আর আপনি ভাবছেন আপনি বিনোদন নিচ্ছেন! কী হাস্যকর!

অনেকে বলেন, হস্তমৈথুন তো স্বাভাবিক। হ্যাঁ, স্বাভাবিক। কিন্তু পর্ন দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিকৃত কল্পনাকে আশ্রয় করে যে হস্তমৈথুন আপনি করছেন, সেটা স্বাভাবিক নয়, ওটা একটা মানসিক ব্যাধি।

আপনি আপনার হাতকে যেভাবে আর যে গতিতে ব্যবহার করতে পারেন, আপনার সঙ্গিনী কি সেভাবে পারবেন? পর্নের দ্রুত দৃশ্যকল্পের সাথে তাল মিলিয়ে আপনি যেভাবে চরম উত্তেজনায় পৌঁছাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, বাস্তব মিলনে সেই গতি বা বৈচিত্র্য থাকে না। ফলে কী হয়? Delayed Ejaculation বা দেরিতে বীর্যপাত। আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও সঙ্গিনীর সাথে মিলনে চূড়ান্ত সুখে পৌঁছাতে পারছেন না। আপনার সঙ্গিনী ভাবছেন, হয়তো তার নিজের মধ্যে কোনো সমস্যা। অথচ আসল অপরাধী আপনি আর আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটা! এই প্রতারণার দায় কে নেবে?

আসুন, কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে কঠিন বাস্তবে চোখ রাখি। এই আসক্তির ফলে কী কী হতে পারে?

1. সম্পর্কে ফাটল: আপনার সঙ্গিনী যখন বুঝবে যে আপনার কাছে তার চেয়ে পর্দার ওই কৃত্রিম নারীরা বেশি আকর্ষণীয়, তখন তার আত্মসম্মানে লাগবে। সম্পর্কটা ভেতর থেকে মরে যাবে।

2. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: আপনি ধীরে ধীরে বাস্তব জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবেন। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার ছেড়ে আপনার ওই একলা ঘরের অন্ধকারই ভালো লাগবে।

3. আত্মবিশ্বাসের মৃত্যু: যখন আপনি বাস্তব মিলনে ঘন ঘন ব্যর্থ হবেন, তখন আপনার পুরুষ হিসেবে আত্মবিশ্বাস মাটিতে মিশে যাবে। আপনি ডিপ্রেশনে ডুব দেবেন।

4. শারীরিক অক্ষমতা: আপনার যৌন অঙ্গগুলো স্বাভাবিক উদ্দীপনায় সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। আপনি চাইলেও আর আগের মতো সক্ষম থাকবেন না।

একটা প্রশ্ন নিজেকে করুন
আজ রাতে আবার যখন পর্ন সাইটটা খুলতে যাবেন, তার আগে আয়নার সামনে একবার দাঁড়াবেন। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা প্রশ্ন করবেন:

"আমি কি একজন জলজ্যান্ত পুরুষের শরীর নিয়ে এক অক্ষম, বিকৃত মানসিকতার ভার্চুয়াল ভিখারি হয়ে বেঁচে থাকতে চাই?"

যখন ভালোবাসার মানুষটার সামনে নিজের পৌরুষ প্রমাণ করতে গিয়ে লজ্জায় আপনার মাথা হেঁট হয়ে যাবে, শরীরটা আর আপনার কথা শুনবে না, তখন এই কয়েক মিনিটের সস্তা আনন্দের জন্য আফসোস হবে না তো?

সিদ্ধান্ত আপনার। শরীরটা আপনার। পুরুষত্বও আপনার। একে স্ক্রিনের নীল আলোয় জ্বালিয়ে দেবেন, নাকি বাঁচিয়ে রাখবেন?
Comments
Post a Comment